
রাজধানীর আদাবরের একটি বাসায় বসবাসকারী রাশেদুল ইসলামের পরিবার এখন মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। কয়েল, অ্যারোসল এমনকি মশারির ব্যবহারেও মিলছে না স্বস্তি। রাতে ঘরের ভেতরেই মশার ঝাঁক আক্রমণ করছে বলে অভিযোগ তাদের। পরিবারের আট বছরের শিশুটির হাত-পায়ে মশার কামড়ে ঘা তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে উদ্বেগে আছেন তার মা-বাবা।
এমন পরিস্থিতি শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং ঢাকার বহু বাসিন্দারই একই অভিজ্ঞতা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, ঢাকায় বর্তমানে মশার প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, মার্চ মাসে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে।
বাংলাদেশে সাধারণত তিন প্রজাতির মশার বিস্তার দেখা যায়—কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। এর মধ্যে কিউলেক্সের বিস্তারই বেশি। কিউলেক্সের কামড়ে ফাইলেরিয়া বা গোদরোগ ও জাপানি এনসেফালাইটিস হয়। তবে এ দুটি রোগ দেশে ততটা প্রকট নয়। এডিসের কামড়ে ডেঙ্গু ও অ্যানোফিলিসের কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়।
আন্তর্জাতিক উদারাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানী মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রথম আলোকে বলেন, জাপানি এনসেফালাইটিসে মৃত্যুর অনুমিত হার ২৫ শতাংশ। এ রোগে রাজশাহী, রংপুর ও পার্বত্য অঞ্চলে অতীতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে দেশে এ রোগ বেশি দেখা যায় না। কারণ, এখানে শূকরের পালন খুব বেশি মাত্রায় নেই।
গবেষকেরা বলছেন, তিন কারণে এবার মশার প্রকোপ বেড়েছে। প্রথমত, এবার শীতের মাত্রা কম আর স্বাভাবিকের চেয়ে একটু আগেই শীত বিদায় নিয়েছে। আবার এ বছর মশার প্রকোপ আগেই শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়ত, নর্দমা ও জলাশয়ের দূষণ যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। তৃতীয়ত, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধির অভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এগোচ্ছে না।
কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার ২৬ বছর ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। সর্বশেষ জরিপে তাঁর দল দুই ভাবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে—মশার লার্ভা বা শূককীটের ঘনত্ব ও প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি গণনা করে।
লার্ভা পরীক্ষা করতে বিভিন্ন জলাশয় থেকে ২৫০ মিলিলিটার পানি তুলে তাতে লার্ভার সংখ্যা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় সংগৃহীত পানিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া যায়। ফেব্রুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ১ হাজার ২৫০-এ।
প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি যাচাইয়ের পদ্ধতিটিও চমকে দেওয়ার মতো। একজন মানুষের হাঁটু পর্যন্ত পা ও বাহু উন্মুক্ত রেখে এক ঘণ্টায় কতটি মশা কামড়াতে আসে, তা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৮৫০।
অধ্যাপক বাশারের আশঙ্কা, মার্চে এ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, এক ঘণ্টায় পাঁচটি মশা কামড়াতে এলেই বিশ্বমানে তা বেশি। সেখানে ঢাকায় ৮৫০টি, এটি কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি বিপৎসংকেত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) পাঁচ এলাকায় মশা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। এখানে মশা বেড়ে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টানা মশার ফাঁদ রেখে এ গবেষণা করা হয়। গত ১৬ থেকে ২০ জানুয়ারি রাজধানীর পাঁচটি এলাকায় ১৭ হাজার ১৫৯টি মশা পাওয়া যায়। আর ৩০ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া যায় ২২ হাজার ৩৬২টি। ওই পাঁচ এলাকা হলো উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের পার্ক, মিরপুর ২–এ ডিএনসিসির ভান্ডার শাখা অফিস, গুলশান ১–এর পুরাতন ভান্ডার শাখা অফিস, মিরপুর ১–এর ১০ নম্বর ওয়ার্ড কমিউনিটি সেন্টার ও মোহাম্মদপুরের ডিএনসিসির আঞ্চলিক অফিস।